
ছবি: কাসেম হারুণ/বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
সিঙ্গাইর(মানিকগঞ্জ) থেকে: বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, এরা জনগণের সরকার নয়। প্রতিনিয়ত পাখির মতো গুলি করে মানুষ হত্যা করছে। এ সরকার খুনী ও জালিম সরকার। এই সরকারের সাথে কোনো আপস নয়। রক্ত ঝরেছে, প্রয়োজনে আরও ঝরবে কিন্তু খুনি সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ ছাড়বেনা বিএনপি। এখন একদফার সরকার পতনের আন্দোলন হবে।
১৮ ও ১৯ মার্চ হরতাল দেওয়া হয়েছে। সরকারকে বিদায়ের জন্য আরও হরতাল অবরোধ দেওয়া হবে বলেও ঘোষণা দেন সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী।
বুধবার বিকেলে মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরের গোবিন্দল ফুটবল মাঠের পথসভা ও চারিগ্রাম এসএ খান উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের বিশাল জনসভায় তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, এই সরকার একটি বিধর্মী সরকার। এরা মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কোনো ধর্মে বিশ্বাস করে না। এদের হাতে দেশ নিরাপদ নয়। এরা মন্দিরে, মসজিদে, গীর্জা প্যাগোডায় হামলা করে।অথচ আমরা আমাদের সময়ে তাদের নিরাপত্তা দিয়েছি, সাহায্য করেছি। এরা ক্ষমতায় থাকলে দেশ ধ্বংস হয়ে যাবে।
এরা গত কয়েকদিনে গুলি করে শতাধিক মানুষকে হত্যা করেছে। ক্ষমতা গ্রহণের কিছুদিন পরই বিডিআর বিদ্রোহে ৫৮জন সেনা হত্যার ঘটনা ঘটেছে, তার বিচার করেনি এ সরকার।
বিএনপিকে মুক্তিযোদ্ধার দল উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই মার্চ মাসে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন জিয়াউর রহমান। তাই দেশরক্ষার দায়িত্ব আমাদের বেশি। স্বাধীনতার পতাকা হাতে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার আহবানও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, সরকার সকল ইস্যু চাপা দিতে পুলিশ পাহারায় শাহবাগে নাস্তিকদের মঞ্চ পেতেছে আর ফাঁসি ফাঁসি খেলা শুরু করেছে। সব যুবক না কী শাহবাগে। তাহলে আজকের মানিকগঞ্জের জড়ো হওয়া এরা কী বুড়ো। এখানে যে ছাত্র যুবকদের কথা বলা হচ্ছে তারা যুবকদের অংশ নয়, সরকারের অংশ, এরা দেশের ক্ষতি করছে। এখন দরকার সরকারের পতন। তাহলে মানুষ নিরাপদে চলতে পারবে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গেও কথা বলেন খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, আমরাও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চাই। কিন্তু এই সরকার শুধু বিএনপি আর জামায়াতে ইসলামীকে ধরে। বিএনপি জামায়াত ছাড়া যুদ্ধাপরাধী দেখে না। নিজের দলের মধ্যে অনেক রাজাকার আছে। এই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশে যখন স্বাধীনতাযুদ্ধ চলে তখন সে পাকিস্তানীদের চাকরি করে। তাহলে সে কি রাজাকার নয়?
গোবিন্দল ফুটবল মাঠে এক পথসভায় পদ্মা সেতু করতে মালয়েশিয়ার সঙ্গে যে চুক্তি করতে চাচ্ছে তা ভাওতাবাজি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ সরকার পদ্মা সেতু করতে পারবে না। আমরা পদ্মায় দুটি সেতু করবো। আপনাদের দাবি মানিকগঞ্জ থেকে পদ্মা সেতু করা। সেজন্য আমি বলেছি পদ্মা সেতু হবে দুইটা। একটা আরিচা-দৌলতদিয়া আর একটা মাওয়া দিয়ে।
সরকারকে দুর্নীতিবাজ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ সরকার দুর্নীতিবাজ। এরা দেশের টাকা বিদেশে পাচার করছে। শেয়ার মার্কেট, হলমার্ক, পদ্মা সেতুর দুর্নীতির কারণে দাতা সংস্থারা আর টাকা দিচ্ছেনা। জনগণের উন্নয়নের জন্য নয়, সরকার চুরিতে ব্যস্ত।
খালেদা জিয়া বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই এখানে গণহত্যা হয়েছে, বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনাল করে প্রধানমন্ত্রীকে সেখানে হাজির করা হবে। আল্লাহর হুকুম ছাড়া যেমন গাছের পাতাও নড়ে না, তেমনি প্রশাসনের কোনো কাজ প্রধানমন্ত্রীর হুকুম ছাড়া হয় না।
সরকারকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, গুলি বন্ধ করুন, নয়তো এর প্রতিদান পেতে হবে। জনগণ বসে বসে মার খাবে গুলি খাবে আর মসনদে বসে আপনারা উপভোগ করবেন তা হবে না।
খালেদা জিয়া বলেন, নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগের নেতা সেখানকার গডফাদার মেধাবী ছাত্র ত্বকীকে হত্যা করেছে। ত্বকীর বাবা মেয়র নির্বাচনের সময় আইভির জন্য কাজ করেছেন, এজন্যই ত্বকীকে হত্যা করা হয়েছে। এখনো কেন শামীম ওসমান বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাকে কেন গ্রেফতার করা হয়নি।
তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফের কোম্পানি ভারত থেকে কম দামে না হয় বিনামূল্যে মেয়াদোত্তীর্ণ ভিটামিন ক্যাপসুল এনেছে, যা খেয়ে অনেক শিশু অসুস্থ হয়েছে। আবার অনেকে মারা গেছে। এই হলো সরকারের কাজ। তারা গুলি করে মানুষ মারছে আবার মেয়াদোত্তীর্ণ ঔষধ খাওয়ায়েও মানুষ মারছে।
নিহতদের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, আজকে কোনো সভা করতে আসিনি। পুলিশের গুলিতে নিহতদের স্বজনদের সমবেদনা দিতে এসেছি। আমরা শুনেছি তাদের কি নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এই সরকার খুনী ও রক্ত পিপাসু, তাই এরা যতদিন ক্ষমতায় থাকবে, ততদিন মায়ের বুক খালি হবে।বোনেরা স্বামী হারা হবে। ছেলে-মেয়েরা পিতৃহারা হবে। তাই আমাদের এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে। আন্দোলন করতে হবে।
সরকারের নানা সমালোচনা করে তিনি বলেন, ইলিয়াস আলীকে গুম করেছে এই সরকার। তার খোঁজ পাওয়া যায়নি। চৌধুরী আলম, ইব্রাহিম মৃধাকে তারা হত্যা করেছে। এই সরকার মানুষকে পাখির মতো গুলি করে মারছে। গত কয়েকদিনে পুলিশ বাহিনী দিয়ে ১৭০ জন মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। সেজন্য তাদের বিচার হবে। আমরা এভাবে মানুষকে মরতে দিতে পারি না।
খালেদা জিয়া বলেন, এই সরকার নির্বাচনের আগে অনেক ওয়াদা দিয়েছিল। দশ টাকায় চাল খাওয়াবে, ঘরে ঘরে চাকরি দেবে। কোনো কিছুই করেনি। চাল, ডাল তেল লবন সব জনগণের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। এই সরকারের অনেক গুণ আছে। ৭৪ সালে তারা দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি করেছিল। তখন লাখ লাখ লোক না খেয়ে মড়েছে। তারা মানুষ মারতে ওস্তাদ। ৭২-৭৫ সালে রক্ষীবাহিনী দিয়ে ৪০ হাজার মানুষ হত্যা করেছিল।
সিঙ্গাইর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান মোহাম্মদ মুজাহারুল হক মোহরের সভাপতিত্বে এসময় বক্তব্য রাখেন হারুন অর রশীদ খান মুন্নু, ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী, খেলাফত মজলিসের চেয়ারম্যান মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক, সিঙ্গাইর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মঈনুল ইসলাম শান্ত, নির্বাহী কমিটির সদস্য আফরোজা খান রিতা।
এসময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সেলিমা রহমান, সাদেক হোসেন খোকা, খায়রুল কবির খোকন, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, শিরিন সুলতানা, আবদুল কাদের ভূইয়া জুয়েল, মানিকগঞ্জ জেলা নাগরিক ফোরামের আহবায়ক সাইফুল হুদা চৌধুরী শাতিল প্রমুখ।
এর আগে তিনি ২৪ ফেব্রুয়ারি হরতাল চলাকালে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত মওলানা নাসিরুদ্দিনের বাড়িতে যান। এসময় তিনি নিহত নাসিরুদ্দিনের মা ফাতেমা বেগমসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। এবং তাদের সমবেদনা জানান।
পরে তিনি একই ঘটনায় নিহত শাহ আলমের মা সহর বানু ও চাচা আবুল কাশেম, নিহত নাজিমুদ্দিনের বাবা মজনু মিয়া ও নিহত আলমগীরের অন্তঃস্বত্ত্বা স্ত্রী রাফেজা বেগম, তাদের দেড় বছরের মেয়ে আঁখি ও বাবা রাজ্জাক মিয়াকেও সমবেদনা জানান। তাদের প্রত্যেকের পরিবারকে তিন লাখ করে টাকা অনুদান দেন তিনি।এছাড়া আহতদের আর্থিক সহায়তা দেন তিনি।
শনিবার দুপুর সোয়া দুইটায় তিনি গুলশানের বাড়ি থেকে মানিকগঞ্জের উদ্দেশে রওনা হন। আমিনবাজার থেকে সিঙ্গাইর পর্যন্ত রাস্তায় দু’পাশে হাজার হাজার মানুষ ব্যানার ফেস্টুনসহ দাড়িয়ে থেকে খালেদা জিয়াকে অভিবাদন জানান। গাড়ির ভেতর থেকে হাত নেড়ে তাদেরকেও শুভেচ্ছা জানান তিনি।
এদিকে বিএনপি চেয়ারপার্সনের আগমন উপলক্ষে গোবিন্দল ও চারিগ্রামে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে বাংলানিউজকে জানিয়েছেন মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক মাসুদ করিম।
উল্লেখ্য, ২৪ ফেব্রুয়ারি ইসলামী দলগুলোর ডাকা হরতাল চলাকালে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হন গোবিন্দল-চারিগ্রাম এলাকার ৪ জন। এসময় গুলিবিদ্ধ হন আরো অর্ধশত।
বাংলাদেশ সময়: ১৮৩৩ ঘণ্টা, মার্চ ১৬,২০১৩
এমএম/সম্পাদনা: নূরনবী সিদ্দিক সুইন, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর eic@banglanews24.com